Skip to main content

মন , আত্মা , পরকাল


১. আমি কে?
মানুষের আমিত্ববোধ যত আদিম ও প্রবল, তত আর কিছুই নহে। আমি সুখী, আমি দুঃখী, আমি দেখিতেছি, আমি শুনিতেছি, আমি বাঁচিয়া আছি, আমি মরিব ইত্যাদি হাজার হাজার রূপে আমি আমাকে উপলব্ধি করিতেছি। কিন্তু যথার্থ ‘আমি’- এই রক্ত-মাংস-অস্থি-মজ্জায় গঠিত দেহটিই কি ‘আমি’? তাহাই যদি হয়, তবে মৃত্যুর পরে যখন দেহের উপাদানসমূহ পঁচিয়া-গলিয়া অর্থাৎ রাসায়নিক পরিবর্তনে কতগুলি মৌলিক পদার্থে রূপান্তরিত হইবে, তখন কি আমার আমিত্ব থাকিবে না? যদি না-ই থাকে, তবে স্বর্গ-নরকের সুখ-দুঃখ ভোগ করিবে কে? নতুবা ‘আমি’ কি আত্মা? যদি তাহাই হয়, তবে আত্মাকে ‘আমি’ না বলিয়া ‘আমার’- ইহা বলা হয় কেন? যখন কেহ দাবী করে যে, দেহ আমার, প্রাণ আমার এবং মন আমার, তখন দাবীদারটি কে?
২. প্রাণ কি অরূপ না সরূপ?
প্রাণ যদি অরূপ বা নিরাকার হয়, তবে দেহবসানের পরে বিশ্বজীবের প্রাণসমূহ একত্র হইয়া একটি অখণ্ড সত্তা বা শক্তিতে পরিণত হইবে না কি? অবয়ব আছে বলিয়াই পদার্থের সংখ্যা আছে, নিরবয়ব বা নিরাকারের সংখ্যা আছে কি? আর সংখ্যা না থাকিলে তাহার স্বাতন্ত্র্য থাকে কি? পক্ষান্তরে প্রাণ যদি সরূপ বা সাকার হয়, তবে তাহার রূপ কি?
৩. মন ও প্রাণ কি এক?
সাধারণত আমরা জানি যে, মন ও প্রাণ এক নহে। কেননা উহাদের চিরত্রগত পার্থক্য বিদ্যমান। আমরা আমাদের নিজেদের উপলবদ্ধি হইতে জানিতে পাইতেছি যে, ‘মন’ প্রাণের উপর নির্ভরশীল, কিন্তু ‘প্রাণ’ মনের উপর নির্ভরশীল নয়। মন নিষ্ক্রিয় থাকিলেও প্রাণের অভাব পরিলক্ষিত হয় না। কিন্তু প্রাণ নিষ্ক্রিয় হইলে মনের অস্তিত্বই থাকে না। যেমন- ক্লোরোফরম প্রয়োগে মানুষের সংজ্ঞা লোপ ঘটে, অথচ দেহে প্রাণ থাকে, শ্বাসক্রিয়া, হৃৎক্রিয়া এমনকি পরিপাকক্রিয়াও চলিতে থাকে। অথচ তখন আর মনের কোন ক্রিয়াই প্রকাশ পায় না। গভীর সুনিদ্রাকালেও কোন সংজ্ঞা থাকে না, ইহা দৈনন্দিন ঘটনা। কিন্তু সংজ্ঞাহীন হইলেই দেহ নিষ্প্রাণ হয় না। ইহা হইতে স্পষ্টই বুঝা যায় যে, প্রাণবিহীন মন থাকিতেই পারে না, কিন্তু মন বা সংজ্ঞাহীন প্রাণ অনেক সময়ই পাওয়া যায়। ইহাতে অনুমিত হয় যে, মন আর প্রাণ এক নহে। ইহাও অনুমিত হয় যে, সংজ্ঞা, চেতনা বা সুখ-দুঃখের অনুভূতি মনেরই, প্রাণের নয়। প্রাণ রাগ, শোক, ভোগ ও বিলাসমুক্ত। এক কথায় প্রাণ চিরনির্বিকার।
জীবের জীবন নাকি যমদূত (আজরাইল) হরণ করেন। কিন্তু তিনি কি প্রাণের সহিত মনকেও হরণ করেন? অথবা প্রাণ যেখানে যে অবস্থায় থাকুক না কেন, মনকে তৎসঙ্গে থাকিতেই হইবে, – এইরূপ কোন প্রমাণ আছে কি? নতুবা মনবিহীন প্রাণ পরকালের সুখ-দুঃখ ভোগ করিবে কিরূপে?
৪. প্রাণের সহিত দেহ ও মনের সম্পর্ক কি?
দেহ জড় পদার্থ। কোন জীবের দেহ বিশ্লেষণ করিলে কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, লৌহ, ফস্ফরাস ইত্যাদি নানা প্রকার মৌলিক পদার্থের বিভিন্ন অনুপাতে অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়। পদার্থসমূহ নিষ্প্রাণ। কাজেই পদার্থসমূহের যথানুপাতে সংমিশ্রিত অবস্থাকেই প্রাণ বলা যায় না। পদার্থসমূহের যথানুপাতে সংমিশ্রণ এবং আরও কিছুর ফলে দেহে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়। ঐ ‘আরও কিছু’কে আমরা মন বলিয়া থাকি। কিন্তু মানুষের দেহ, মন ও প্রাণে কিছু সম্পর্ক বা বন্ধন আছে কি? থাকিলে তাহা কিরূপ? আর না থাকিলেই বা উহারা একত্র থাকে কেন?
৫. প্রাণ চেনা যায় কি?
কোন মানুষকে ‘মানুষ’ বলিয়া অথবা কোন বিশেষ ব্যক্তিকে আমরা তাহার রূপ বা চেহারা দেখিয়াই চিনিতে পাই, প্রাণ দেখিয়া নয়। পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন সকলকে রূপ দেখিয়াই চিনি, সম্বোধন করি, তাহাদের সাথে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম নিষ্পন্ন করি। প্রাণ দেখিয়া কাহাকেও চিনিবার উপায় নাই। তদ্রূপ- পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ, গাছ-পালা ইত্যাদিকে আমরা উহাদের রূপ দেখিয়াই চিনিয়া থাকি। এই রূপ বা চেহারা দেহীর দেহেই প্রকাশ পাইয়া থাকে। যখন দেহের সঙ্গে প্রাণের সম্পর্ক থাকিবে না অর্থাৎ মৃত্যুর পরে দেহহীন প্রাণকে চিনিবার উপায় কি? বিভিন্ন ব্যক্তি বা জীবের মন, জ্ঞান ও দৈহিক গঠনে যতই বৈচিত্র্য থাকুক না কেন, উহাদের প্রাণেও কি তেমন বৈচিত্র্য আছে? অর্থাৎ বিভিন্ন জীবের প্রাণ কি বিভিন্নরূপ?
৬. আমি কি স্বাধীন?
‘আমি মনুষ্যদেহধারী মনপ্রাণবিশিষ্ট একটি সত্তা। প্রাণশক্তিবলে আমি বাঁচিয়া আছি, মনে নানা প্রকার কার্য করিবার স্পৃহা জাগিতেছে এবং দেহের সাহায্যে কার্যাবলী নিষ্পন্ন করিতেছি। আমি যে শারীরিক ও মানসিক শক্তির অধিকারী, তাহা আমার কার্যাবলীর মধ্যেই প্রকাশ পাইতেছে। কিন্তু এখানে প্রশ্ন এই যে, আমি স্বাধীন কি-না! যদি আমি স্বাধীন হই অর্থাৎ আমার কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ঈশ্বরের না থাকে, তাহা হইলে তাঁহার ‘সর্বশক্তিমান’ নামের সার্থকতা থাকে কি? আর যদি আমি স্বাধীন না-ই হই, তবে আমার কার্যাবলীর ফলাফলস্বরূপ পাপ বা পুণ্যের জন্য আমি দায়ী হইব কিরূপে?
৭. অশরীরী আত্মার কি জ্ঞান থাকিবে?
মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে জ্ঞানের উৎপত্তি হয়। এই পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের কোন একটির অভাব থাকিলে, ঐ ইন্দ্রিয়টির মাধ্যমে যে জ্ঞান হইতে পারিত, তাহা আর হ না। যে অন্ধ বা বধির, সে আলো বা শব্দে জ্ঞান পাইতে পারে না। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের অভাবে জ্ঞানের অভাব পরিলক্ষিত হয়। মৃত্যুতে মানুষের দেহ নষ্ট হয় এবং তৎসঙ্গে ইন্দ্রিয়গুলিও নষ্ট হয়।
এখন প্রশ্ন এই যে, মৃত্যুর পরে শরীর ও ইন্দ্রিয়বিহীন আত্মার জ্ঞান থাকিবে কি?
থাকিলে তাহা কিরূপে থাকিবে?

-আরজ আলী মাতব্বর-

Comments

Popular posts from this blog

মুহাম্মদ এর স্ত্রীর সংখ্যা ও নাম

মুহাম্মদ সা. ১১ থেকে ১৪ জন নারীকে বিয়ে করেছেন। (এগারোর পরের ৩ জনের এই সংখ্যা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।) নিম্নে তাদের নামের তালিকা দেয়া হল:- ০১.খাদিজা বিনতু খুওয়াইলিদ (৫৯৫-৬১৯): মহানবী ২৫ বছর বয়সে ৪০ বছরের খাদিজাকে বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন ধনাঢ্য, বুদ্ধিমতি, বিচক্ষণ, বিশ্বাসী, সুন্দরী। তাকে বলা হয়েছে সর্বোত্তম নারী। ০২.সাওদা বিনতে উমর(৬১৯-৬৩২): মহানবী ৫১ বছর বয়সে তাকে বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন সুন্দরী, স্বাস্থ্যবতী, দীর্ঘাঙ্গী, অহিংসুক, বিধবা। ০৩.আয়িশা (৬১৯-৬৩২): মহানবী ৫২ বছর বয়সে ৬ বছরের আয়িশাকে বিয়ে করেন। মহানবী তার সাথে দাম্পত্যজীবন শুরু করেন বিয়ের তিন বছর পরে। তিনি ছিলেন খলিফা আবু বকরের কন্যা, প্রজ্ঞা-জ্ঞানবতী, প্রত্যুৎপন্নমতি, স্মৃতিশক্তি ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন, সুন্দরী, উদার ও মহৎ। ০৪.হাফসা বিনতে উমর (৬২৪-৬৩২): মহানবী ৫৪ বছর বয়সে তাকে বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন সুন্দরী, গুণবতী, খলিফা ওমরের কন্যা ও বিধবা। ০৫.জয়নব বিনতে খুযায়মা (৬২৫-৬৩২): মহানবী ৫৫ বছর বয়সে তাকে বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন বিধাব, নিঃশ্বদের জননী, সুন্দরী। ০৬.উম্মে সালমা হিন্দ বিনতু আবি উমাইয়া (৬২৯-৬৩২): মহানবী ৫৫ বছর বয়সে তাকে ব...

ঈশ্বরের ধর্ম - মাটি ও ঈশ্বর

মাটি  ও ঈশ্বর  মাটি বড়ই দৈর্যশীল একটি সত্তা , মাটিকে মানুষ যতই কাটাকাটি, পিটাপেটি করুকনা কেন মাটি কখনোই মানুষকে এর ফিডব্যাক দেয়না। মাটি মানুষের এই চরম অত্যাচার সহ্য করে আসছে অনন্ত কাল অবদি, এটাই হয়ত মাটির ধর্ম । এই মাটি মানুষকে অনেক কিছু শিখাতেও চায় বিনামূল্যে,বিনাঘামে। মানুষ তাও মানতে চায় না। মানুষ তার নিজস্ব লালিত শিক্ষায় অনড় থাকতেই সাচ্ছন্দ বোধকরে। এতেও মাটির কোনো ফিডব্যাক নেই। মাটির ধর্মই যেন মানুষের নিপীড়ন সহ্য করা। অন্যদিকে ঈশ্বরের ধর্মও মাটির মতই। মানুষ ঈশ্বরকে রূপায়িত করেছে নানা রূপে , একেক জন একেক রূপে তাকে নানা রকম গালাগাল দিচ্ছে। মানুষ ঈশ্বরকে হাজার হাজার ধর্মের দায়িত্ব দিয়ে নিজ  নিজ মতে ভাগাভাগি করলেও তাতেও ঈশ্বরের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। ঈশ্বর যেন মাটির ওই অনুসারী। মাটির সাথে ঈশ্বরের অনেকটাই মিল রয়েছে , ঈশ্বরের ধর্ম  ঈশ্বর সর্ব শক্তিমান, সৃষ্টি জগতের মালিক, মানুষের নিয়ন্তা, নেয় বিচারক,পরম করুণাময়  দয়ালু , ক্ষমাকারী, সাহায্যকারী।কিন্ত ব্যাপার হলো, তার এইসব মহান কর্মসাধনের জ...

An fool elephent

free your minds A huge elephant was tied with a short/slim and thin rope. There wasn't any chain and cage.It was a surprise when one boy went on the road and this is surprised him this fact. His thinking is that elephants can slit this rope one by on easy. It does not matter to him.The boy asked the elephant trainer what was the event! Why doesn't the elephant run away from the ropes?The trainer said, "When they were young, they were tied in a slim rope that would have been competent to t ied theirs. It was a good fit for them. In the absence of a again and again effort, this rope could not be slit by an elephant, it seems to him that it will never be possible to him. So still this is have her mind is as strong as the previous rope... But, if we tried again, we could have slit the rope of failure! So where everyone will stop, we will have to start from there.Stopped means losing.Like this elephant we don't do any any effort after repeated failures of ...